ইংল্যান্ড ক্রিকেটের এক সাহসী, আগ্রাসী ও দর্শকদের প্রিয় মুখ রবিন স্মিথ আর নেই। অস্ট্রেলিয়ার পার্থে নিজ বাসায় তিনি আকস্মিকভাবে মারা যান। বয়স হয়েছিল মাত্র ৬২। ক্রিকেট বিশ্ব শোক জানিয়েছে এক নিষ্পাপ হাসির যোদ্ধার বিদায়ে, যে মাঠে ছিল নির্ভীক, আর মাঠের বাইরে বহু বছর লড়াই করেছে নিজের মন—নিজের ভেতরের দানবদের সঙ্গে।
১৯৮৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখে দ্রুতই ব্যাট হাতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। ৬২ টেস্ট, ৪২৩৬ রান, ৯ সেঞ্চুরি, গড় ৪৩.৬৭—সংখ্যাগুলো তার গল্প বলে আংশিক, তবে তার প্রকৃত গল্প লেখা রয়েছে গ্রিনিজ, মার্শাল, অ্যামব্রোজ ও ওয়ালশদের সামনে দাঁড়িয়ে খেলায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভয়ংকর পেস আক্রমণের বিপক্ষে তার সেরা রূপটা দেখা যেত।
তার স্কয়ার কাট ছিল যেন শট নয়, শিল্প। এমন শট খেলে তিনি ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ম্যাচ জেতাতে সাহায্য করেছেন, ঘরের মাঠে হাই-ভোল্টেজ সিরিজে ঝড় তুলেছেন। ১৯৯৩ সালের এজবাস্টনের সেই অপ্রতিরোধ্য ১৬৭ নটআউট—যা দুই যুগেরও বেশি সময় ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ওয়ানডে স্কোর হিসেবে ছিল—আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান।
তবু জীবনের গল্প ছিল উত্থান-পতনে ভরা। স্পিনের বিপক্ষে তার দুর্বলতা, বিশেষ করে ১৯৯৩ অ্যাশেজে শেন ওয়ার্নের আবির্ভাব, তার ক্যারিয়ারে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইংল্যান্ড তাকে বাদ দিলে অনেকেই মনে করেছিলেন সে সিদ্ধান্ত ছিল অতিদ্রুত। কিন্তু ভাগ্যের চমকে সেই ওয়ার্নই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন স্মিথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্ম নেওয়া এই ক্রিকেটার ছোটোবেলা থেকেই ছিলেন নিবেদিত। বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে বাবা নির্মাণ করেন একটি বিশেষ নেট। সেখানে ব্যারি রিচার্ডস ও মাইক প্রোক্টরের মতো কিংবদন্তির সঙ্গে অনুশীলন করেই বড় হয়েছেন স্মিথ।
ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলেন ৩২ বছর বয়সে—যে বয়সে অনেক ব্যাটার সবচেয়ে উজ্জ্বল থাকে। কিন্তু ইংল্যান্ড তখন বদলে ফেলেছিল দিক-নির্দেশনা, এবং স্মিথকে আর প্রয়োজন মনে করা হয়নি। এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন আঘাতগুলোর একটি।
ক্রিকেটের পরবর্তী জীবন ছিল অনেক বেশি কঠিন। তিনি বহু বছর অ্যালকোহল ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ২০১৯ সালের বইতে তিনি নিজের হৃদয়ের দাগগুলো তুলে ধরেন। তবুও মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি হাসিমুখে অ্যাশেজ টেস্টে উপস্থিত হয়ে জানিয়েছিলেন নিজের সুস্থতার অগ্রগতির কথা।
তার পরিবার জানিয়েছে—সে সব লড়াই কোনোভাবেই তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ময়নাতদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। পরিবার মিডিয়াকে অনুরোধ করেছে শান্তি দিতে।
ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছেন,
“রবিন স্মিথ ছিলেন এমন এক ব্যাটসম্যান, যিনি দ্রুতগতির বোলিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে দুঃসাহসী হাসি দিতেন। তার ১৬৭* ইংল্যান্ডের ইতিহাসে একটি স্মারক ইনিংস হয়ে থাকবে।”
ক্রিকেট বিশ্ব আজ হারিয়েছে এক লড়াকু হৃদয়ের মানুষকে।