বাংলাদেশের গর্ব তামিম পেলেন এমসিসির আজীবন সম্মাননা সদস্যপদ

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আরও একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় যুক্ত হলো সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবালের অর্জনের তালিকায়। বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট প্রতিষ্ঠান মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) তাকে সম্মানসূচক আজীবন সদস্যপদ প্রদান করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সাফল্য, নেতৃত্বগুণ এবং খেলাটির প্রতি অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।

রোববার (২৮ জুন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এমসিসি জানায়, এ বছর মোট পাঁচজন বিশিষ্ট ক্রিকেট ব্যক্তিত্বকে সম্মানসূচক আজীবন সদস্যপদ দেওয়া হচ্ছে। তামিম ইকবালের পাশাপাশি এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি দুই নারী ক্রিকেটার সুজি বেটস ও সোফি ডিভাইন, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার মেল জোন্স এবং ভারতের অভিজ্ঞ ব্যাটার চেতেশ্বর পূজারা। ক্রিকেটে তাঁদের দীর্ঘদিনের অবদান, সাফল্য এবং খেলাটির বিকাশে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তামিম ইকবাল অন্যতম সফল ওপেনিং ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় জাতীয় দলের হয়ে তিন সংস্করণেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। বিশেষ করে একদিনের আন্তর্জাতিক ও টেস্ট ক্রিকেটে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইনিংসের শুরুতে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্বশীল ব্যাটিং করার দক্ষতার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।

টেস্ট ক্রিকেটে তামিম পাঁচ হাজারের বেশি রান সংগ্রহ করেছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অর্জন। দেশের হয়ে টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ২০১০ সালে ইংল্যান্ড সফরে। ঐতিহাসিক লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শতরান করে তিনি অনার্স বোর্ডে নিজের নাম লেখান। বিশ্বের ক্রিকেটারদের কাছে লর্ডসের অনার্স বোর্ডে জায়গা পাওয়া বিশেষ সম্মানের বিষয়, আর তামিম সেই বিরল কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটারদের একজন।

একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তার অবদান সমানভাবে উজ্জ্বল। বাংলাদেশের হয়ে ২৪৩টি ওয়ানডে ম্যাচে আট হাজারের বেশি রান করে তিনি দেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের আসনে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে দলের ব্যাটিং বিভাগের প্রধান ভরসা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। নতুন বলে প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা থেকে শুরু করে বড় ইনিংস গড়ে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেওয়া—উভয় ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন সফল।

ব্যক্তিগত স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও তামিমের অর্জন ঈর্ষণীয়। ২০১১ সালে ক্রিকেটের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশনা উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক তাকে বর্ষসেরা ক্রিকেটার এবং বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে সে সময় বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী অন্যতম আলোচিত ক্রিকেটারে পরিণত হন তিনি।

এমসিসির সম্মানসূচক আজীবন সদস্যপদ পাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের তালিকায় তামিম দ্বিতীয়। এর আগে এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন সাকিব আল হাসান। ফলে বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক ক্রিকেট প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্যদের তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আরও শক্তিশালী হলো।

তামিমের সঙ্গে সম্মাননা পাওয়া সুজি বেটস ও সোফি ডিভাইন নারী ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে অসাধারণ অবদান রেখে আসছেন। দুজনই চলতি আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার এবং নারী ক্রিকেটের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ এমসিসি এই সম্মাননা প্রদান করেছে। একইভাবে মেল জোন্স ও চেতেশ্বর পূজারাও নিজ নিজ দেশের ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

১৭৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ক্রিকেটের আইন প্রণয়ন, খেলাটির ইতিহাস সংরক্ষণ এবং বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট সংস্কৃতির বিকাশে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অসাধারণ অবদান রাখা খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরই সাধারণত এই সম্মানসূচক আজীবন সদস্যপদ দেওয়া হয়। সেই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় তামিম ইকবালের অন্তর্ভুক্তি শুধু তার ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতিই নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক মর্যাদারও একটি উজ্জ্বল প্রতীক।

মন্তব্য করুন