৩৫৯ রান তাড়া করে দাপুটে জয়: পরিকল্পনাবদ্ধ ক্রিকেটে ভারতকে হারাল দক্ষিণ আফ্রিকা

রায়পুরে ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়টা ছিল শুধু একটি সফল রান তাড়া নয়; বরং ছিল আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে চেজ পরিকল্পনা কীভাবে সাজাতে হয় তার এক নিখুঁত পাঠ। ভারতের বিশাল ৩৫৮ রানের পাহাড়সম স্কোরকে টপকে প্রোটিয়ারা ম্যাচ জিতেছে ৪ উইকেট হাতে রেখে এবং ৪ বল বাকি থাকতেই। এর ফলে তিন ম্যাচের সিরিজে সমতা ফেরাল টেম্বা বাভুমার দল। দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে ইতিহাসে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের কৃতিত্ব, এবং ভারতের বিপক্ষে যৌথভাবে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের বিশ্বরেকর্ডের ভাগীদার হলো তারা। এর আগে ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়া ভারতের বিপক্ষে একই রান তাড়া করতে সফল হয়েছিল।

ম্যাচ জয়ের ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত পরিমিত, গণিতের মতো পরিপাটি। শুরুতে ওপেনার এইডেন মার্করাম দলকে যে ভিত্তিটা দিয়েছেন, সেটিই পুরো ইনিংসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। মাত্র ২৫ ওয়ানডে ইনিংস খেলে ওপেনার হিসেবে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেলেন তিনি—৯৮ বলে ১১০ রানের দৃঢ় ইনিংসে ছিল ১২টি চার এবং একাধিক সুগঠিত শটের প্রদর্শন। মার্করামের ব্যাটিং ছিল ধীরস্থির হলেও সুযোগ পেলেই বাউন্ডারি খুঁজে নেওয়ার মতো। এই চাপ-পরিস্থিতিতে ইনিংস বড় করার দক্ষতাই তাঁকে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার এনে দেয়।

মার্করামের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে টেম্বা বাভুমার ১০১ রানের জুটি দক্ষিণ আফ্রিকার চেজকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়। বাভুমা তার স্বভাবসুলভ গ্রিটি ব্যাটিংয়ে ৪৮ বলে ৪৬ রান করেন। তাদের জুটি যখন ভাঙে, তখনো দক্ষিণ আফ্রিকা দুর্দান্ত গতিতে এগোচ্ছিল। এরপর মার্করাম যোগ দেন ম্যাথু ব্রিটজকের সঙ্গে, যিনি খেলেন অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত কিন্তু আক্রমণাত্মক এক ইনিংস। এই তৃতীয় উইকেট থেকে আসে ৫৫ বলে ৭০ রান—যা মোট রান তাড়ায় গতির পার্থক্য ঘুচিয়ে দেয়।

দলীয় ১৯৭ রানে মার্করাম আউট হয়ে গেলে ম্যাচটা কিছুটা খোলা মনে হচ্ছিল। কিন্তু ব্রিটজকে এবং তরুণ আগ্রাসী ব্যাটার ডেভাল্ড ব্রেভিস মিলে ভারতীয় বোলারদের পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ করে দেন। ব্রেভিস মাত্র ৩৪ বলে ৫৪ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলে ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেন। অন্যদিকে ব্রিটজকে ৬৪ বলে ৬৮ রান করে তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সপ্তম ফিফটি পূর্ণ করেন মাত্র ১১ ম্যাচ খেলেই। এই জুটি থেকে ওঠা ৯২ রানই ছিল মূল ব্যবধান-গড়ে দেওয়া অংশ।

ইনিংস জুড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা চেজটি পরিকল্পনামাফিক এগিয়েছে—

  • প্রথম ১০ ওভারে ৫১

  • ২০ ওভারে ১১৮

  • ৪০ ওভারে ২৮২

অর্থাৎ রান রেট কখনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। শেষদিকে ব্রিটজকে আউট এবং টনি ডি জর্জির ইনজুরি চাপে ফেললেও অলরাউন্ডার করবিন বশের ১৫ বলে ২৯ রানের ঝড়ো ক্যামিও জয় নিশ্চিত করে।

এর আগে ভারত ভরসা পেয়েছিল কোহলি–গায়কোয়াড় জুটিতে। যশস্বী (২২) এবং রোহিত (১৪) দ্রুত ফেরায় চাপ বাড়লেও কোহলি ৯৩ বলে ১০২ রানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ইনিংসের হাল ধরেন। এটি তার ৮৪তম আন্তর্জাতিক ও ৫৩তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি—শচীন টেন্ডুলকারের ১০০ সেঞ্চুরির রেকর্ডের আরও কাছে পৌঁছে গেলেন তিনি। রুতুরাজও ৮৩ বলে ১০৫ রানের ক্যারিয়ার–সেরা সেঞ্চুরি করে তাকে দারুণ সঙ্গ দেন। তাদের ১৯৫ রানের জুটি ভারতের বড় সংগ্রহে মূল ভূমিকা রাখে।

তবে দিনশেষে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং-শৃঙ্খলা, পরিস্থিতি বিশ্লেষণের বুদ্ধিমত্তা এবং তরুণদের সাহসী ক্রিকেটই ভারতের বড় স্কোরকে তুচ্ছ প্রমাণ করে দিল।

মন্তব্য করুন