হঠাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বেন স্টোকসের অবসরের ঘোষণা

নটিংহাম টেস্টের আবহে তখন শুধুই মাঠের লড়াইয়ের উত্তেজনা। নাইটক্লাব-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক বিতর্ক কাটিয়ে সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চেয়ে অধিনায়ক হিসেবেই নটিংহাম টেস্টে মাঠে নেমেছিলেন বেন স্টোকস। ম্যাচের প্রথম তিন দিন খেলা যেমন স্বাভাবিক ছন্দে এগিয়েছিল, তেমনি দলের পরিবেশেও কোনো পরিবর্তনের আভাস ছিল না। তবে চতুর্থ দিনে ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। সবাইকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে হঠাৎই অবসরের ঘোষণা দিলেন ইংল্যান্ডের এই আধুনিক কিংবদন্তি অলরাউন্ডার।

চলমান নটিংহাম টেস্টই হতে যাচ্ছে বেন স্টোকসের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। এই ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আর কখনোই ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী সাদা কিংবা রঙিন জার্সিতে মাঠে নামবেন না ক্রিকেটের অন্যতম সেরা এই ‘ম্যাচ উইনার’।

ম্যাচের চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনের খেলা শেষ হওয়ার পর ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের ডেকে এক জরুরি সভায় বসেন স্টোকস। সেখানেই তিনি নিজের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানান। বিদায়ের এমন আকস্মিক ক্ষণে কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইংলিশ অধিনায়ক। সতীর্থদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “মাঠে গিয়ে আগামী দুই দিনে তোমরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দাও।” তাঁর এই আবেগঘন বক্তব্য শেষ হওয়ার পর ড্রেসিংরুমে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। ইংল্যান্ড দলের সমস্ত খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফের সদস্যরা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে এই মহান ক্রিকেটারকে সম্মান জানান।

হঠাৎ কেন এই বিদায়, তার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ অবশ্য খোলাসা করেননি স্টোকস। তবে তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জড়িয়ে ছিল দলের প্রতি আজীবন নিবেদনের সুর। তিনি বলেন, “দলের জন্য, তোমাদের জন্য এবং যারা আমাদের আগে এই ঐতিহাসিক জার্সি পরেছেন, তাদের জন্য আমি সবসময় নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর মাত্র একবার সেই লড়াইটা লড়ব।”

স্টোকসের এমন আকস্মিক বিদায়ের ঘোষণায় ক্রিকেট বিশ্বে শোরগোল পড়ে গেছে। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) প্রধান নির্বাহী রিচার্ড গুল্ড স্টোকসের অসামান্য অবদানের প্রশংসা করে এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা হারাচ্ছি একজন দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান, অত্যন্ত কার্যকর বোলার, অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক এবং ড্রেসিংরুমের অন্যতম সেরা এক ব্যক্তিত্বকে। ইংল্যান্ড ক্রিকেটে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তার ও তার পরিবারের আগামী দিনের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানাই।”

২০১১ সালের জুন মাসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয়েছিল নিউজিল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই তারকার। এর ঠিক এক মাসের ব্যবধানে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতেও তাঁর অভিষেক হয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই দ্রুত নিজেকে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।

ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসের দুটি বড় সাফল্যের অন্যতম রূপকার ছিলেন স্টোকস। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই অবিশ্বাস্য ইনিংস কিংবা ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ে তাঁর অবদান ক্রিকেটপ্রেমীরা আজীবন মনে রাখবেন। শুধু সীমিত ওভারের ক্রিকেটেই নয়, সাদা পোশাকেও হেডিংলি টেস্টের মতো মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে অ্যাশেজ সিরিজে ইংল্যান্ডকে এনে দিয়েছেন অনেক স্মরণীয় জয়।

বিদায়বেলায় বেন স্টোকসের গৌরবময় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:

ক্রিকেট সংস্করণম্যাচের সংখ্যামোট রানসেঞ্চুরিফিফটিউইকেট সংখ্যা
টেস্ট ক্রিকেট১২২৭,২৪৩১৪৩৭২৫২
ওয়ানডে ক্রিকেট১১৪৩,৪৬৩২৪৭৪
টি-টোয়েন্টি৪৩৫৮৫২৬

পরিসংখ্যানের এই খতিয়ানই বলে দেয়, ব্যাট ও বল হাতে কতটা প্রভাব বিস্তার করে খেলেছেন তিনি। নটিংহাম টেস্টের বাকি দিনগুলোতে ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখ এখন শুধুই স্টোকসের দিকে, যিনি শেষবারের মতো লড়ছেন তাঁর প্রিয় জার্সি গায়ে দিয়ে।

মন্তব্য করুন